নয়াদিল্লি, ২৫ জুলাই ২০২৬: শেষমেশ চাপের কাছে নতিস্বীকার করতেই হলো কেন্দ্রকে। শনিবার বিকেলে রাষ্ট্রপতি ভবন ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পদত্যাগপত্র পাঠালেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। NEET-UG পরীক্ষা ঘিরে প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগ যেভাবে গোটা দেশকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছিল, তার সামনে আর টিকে থাকা গেল না। দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে কলকাতা, মুম্বাই, পাটনা, রাজস্থানের কোটা — সব জায়গাতেই একই দাবি উঠছিল বহুদিন ধরে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে লাখো পরীক্ষার্থী আর তাঁদের অভিভাবকরা রাস্তায় ছিলেন। দাবি একটাই — শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, আর নিরপেক্ষ কোনো সংস্থাকে দিয়ে নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া। আন্দোলন যত দিন গড়িয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে যে সরকারকে একটা না একটা পদক্ষেপ নিতেই হবে। পদত্যাগপত্রে কী লিখলেন প্রধান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে পাঠানো দুই পাতার চিঠিতে ধর্মেন্দ্র প্রধান জানিয়েছেন, দেশের যুবসমাজের আস্থা যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে আর পরিস্থিতি যাতে আর না বিগড়োয়, সেই বিবেচনা থেকেই তিনি সরে দাঁড়াচ্ছেন। চিঠিতে তাঁর কথায় স্পষ্ট একটা আক্ষেপের সুর — গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে পীড়া দিয়েছে বলে লিখেছেন তিনি। বিষয়টা রাজনীতি বা নিজের সম্মানের নয় বলেও দাবি করেছেন প্রধান — বরং কোটি কোটি তরুণের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। কেউ যেন এই অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে দেশের পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে, সেই দায়বোধ থেকেই তাঁর এই সিদ্ধান্ত। মে মাসে NEET-UG পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গেই যে সরকার বিষয়টিকে হালকাভাবে নেয়নি, সেটাও উল্লেখ করতে ভোলেননি তিনি — তদন্তভার তুলে দেওয়া হয়েছিল সিবিআইয়ের হাতে। কিন্তু তদন্ত চলাকালীনও শিক্ষার্থীদের জীবন যেভাবে থমকে গিয়েছিল, আর আন্দোলন যেভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল, তাতে নৈতিক দায় এড়ানো সম্ভব ছিল না বলেই মনে করছেন তিনি। গোড়ার কথা আসল গোলমাল শুরু হয়েছিল মে মাসের NEET-UG পরীক্ষা দিয়ে। পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই একের পর এক অভিযোগ উঠতে থাকে — প্রশ্নফাঁস, অস্বাভাবিক নম্বর, এমনকি একই পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে বহু পরীক্ষার্থীর শীর্ষস্থান দখল করার মতো ঘটনাও সামনে আসে। এরপর যা হওয়ার তাই হলো — গোটা দেশে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। আন্দোলনকারীদের দাবি মোটামুটি তিনটি জায়গায় আটকে ছিল — শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, পরীক্ষা বাতিলের পর মানসিক চাপে প্রাণ হারানো পরীক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ, আর শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে যেন কোনো পুলিশি বা আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তার লিখিত নিশ্চয়তা। মন্ত্রক বারবার আশ্বাস দিয়েছে, আলোচনার টেবিলেও ডেকেছে প্রতিনিধিদের — কিন্তু আন্দোলনকারীরা এক চুলও নড়েননি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত সরকারের ভাবমূর্তি বাঁচাতে আর সংসদে বিরোধীদের চাপ সামলাতেই এই পদত্যাগ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না। রাস্তায় উচ্ছ্বাস, বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া খবরটা ছড়িয়ে পড়তেই যন্তর মন্তর, কোটা আর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে উৎসবের চেহারা নেয়। আন্দোলনকারী প্রতিনিধিদের কথায়, এই জয় আসলে গোটা ছাত্রসমাজ আর সাধারণ মানুষের সম্মিলিত শক্তির প্রমাণ। তবে বিরোধীরা এখনই খুশি হতে নারাজ। পদত্যাগকে স্বাগত জানালেও তাঁদের বক্তব্য পরিষ্কার — এটা শুধু শুরু। আসল কাজ বাকি এখনও — গোটা পরীক্ষাব্যবস্থার ঢেলে সাজানো, আর ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সিকে হয় সংস্কার নয়তো তুলে দিয়ে একটা বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প তৈরি করা। এখন কী হবে শিক্ষা মন্ত্রকের দায়িত্ব আপাতত কার কাঁধে যাবে, সে বিষয়ে রাষ্ট্রপতি ভবন বা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে এখনও কোনো ঘোষণা আসেনি। জল্পনা চলছে দুই দিকেই — কোনো সিনিয়র মন্ত্রীকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে, অথবা নতুন মুখ ঘোষণা হতে পারে খুব শিগগিরই। এদিকে সরকার একটা বড় পদক্ষেপের দিকে এগোচ্ছে বলে সূত্রের খবর — জাতীয় স্তরের প্রবেশিকা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোতে দুর্নীতি রুখতে কড়া ‘অ্যান্টি-পেপার লিক’ আইন কার্যকর করা হবে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট বা বিশেষ আদালত গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।